মূল্যবান ১১টি তথ্য যা আপনার জেনে রাখা জরুরি

স্বাস্থ্য

আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ স্বাস্থ্য, আর তাই স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমরা প্রতিদিন নতুন নতুন অনেক কিছু শেখার চেষ্টা করি। এসব তথ্য আমাদের জ্ঞানকে যেমন উন্নত করে তেমনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ।

এখানে আমরা সাম্প্রতিক কিছু গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে ১১টি তথ্য উপস্থাপন করেছি যা আপনার জেনে রাখা খুব জরুরি।

১. পুরুষের তুলনায় নারীর ঘুম বেশি প্রয়োজন

স্বাস্থ্যকে ঠিকঠাক রাখতে ভালো খাবারের পাশাপাশি ভালো ঘুমেরও প্রয়োজন। সুস্বাস্থ্যের জন্য ঘুম খুব উপকারী। দিনের সব শারীরিক, মানসিক ক্লান্তি কাটিয়ে পরের দিনের জন্য নিজেকে চাঙ্গা করে ফিরে পেতে ভালো ঘুমের বিকল্প নেই। সম্প্রতি এক গবেষণায় বলা হয়, পুরুষের তুলনায় নারীর বেশি ঘুম প্রয়োজন। গবেষণাটি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক। এতে নেতৃত্ব দেন মানসিক স্বাস্থ্য ও ঘুমবিষয়ক বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষক মাইকেল ব্রেয়াস।

গবেষকরা বলেন, কার কতটুকু ঘুম প্রয়োজন সেটি অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। এগুলো কিছুটা জৈবিক। মস্তিষ্কে শক্তি ব্যয়ের ওপর কতটুকু ঘুমাতে হবে সেটি নির্ভর করে। আর নারীদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের শক্তি বেশি ব্যয় হয়।

২. যাদের দেখতে কম বয়সী মনে হয় তারা বাঁচে বেশি দিন

ক্রোমোজোমের অগ্রভাগে থাকা ডিএনএ এর একটি কাঠামোর নাম টেলোমেয়ার, যা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমান্বয়ে ছোট হতে থাকে। ছোট আকৃতির টেলোমেয়ার অকাল বার্ধক্য এবং নানা রোগব্যাধির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এর দৈর্ঘ্য মেপে বিজ্ঞানীরা দেখতে পারেন ব্যক্তি কত দ্রুত বৃদ্ধ হয়ে পড়ছেন এবং তাঁরা ব্যক্তির বয়সও (বায়োলজিক্যাল) পরিমাপ করতে পারেন। এর সাথে জড়িত রয়েছে বয়সের চেয়ে কম দেখানোর বিষয়টি। ৩৮৭ জোড়া জমজদের নিয়ে পরিচালিত ডেনমার্কের গবেষকদের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কারো মুখ দেখেই বলে দেওয়া সম্ভব সে বয়স পাবে নাকি অল্প বয়সেই মারা যাবেন। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, আসল বয়সের চেয়ে যাদের কম বয়সী দেখায়, তারা অন্যদের চেয়ে দীর্ঘজীবী হয়।

৩. বাবা-মাকে ছাপিয়ে যেতে পারলে পুরুষ সুখী হয়

মানুষের জীবন বহুমাত্রিক। একেকজনের জীবনদর্শনও একেক রকম। সেই অনুযায়ীই ওঠা-নামা করে সুখের সূচক। কেউ সুখ পান টাকা কামিয়ে। কেউ আবার পড়াশোনাতেই পান আনন্দ। কারও আবার দাম্পত্য সুখেই স্বস্তি। আবার নারী-পুরুষভেদেও সুখের সংজ্ঞা আলাদা। ঠিক এ বিষয়টি নিয়েই সম্প্রতি গবেষণা করেছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। আর তাতে পাওয়া গেছে চমক জাগানিয়া ফলাফল।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, পুরুষেরা সব সময়ই বাবা-মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাপিয়ে যেতে চান। তাতেই নিজেকে সফল বলে মনে করেন পুরুষ। আর সেটি না হলেই অসন্তুষ্টিতে ভোগেন তারা। সেই অসুখী মনের প্রভাব পড়ে পুরুষের কাজে ও জীবনে। অন্যদিকে, নারীদের সুখী হওয়ার ক্ষেত্রে এসবের কোনো বালাই নেই। সুখী হওয়ার জন্য বাবা-মাকে ছাপিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে জাগে না তাঁদের।

৪. সঙ্গীর সঙ্গে সাদৃশ্য থাকালে জীবন সুখী হয়

নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁরা বলছেন, সঙ্গীর মধ্যে সাদৃশ্য থাকার বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে প্রভাব ফেলে না; বিশেষ করে কোনো বিষয়ে একমত হওয়ার মতো বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে।

তবে অন্য একটি পৃথক গবেষণায় আবার দেখা গেছে, ব্যক্তিত্বের বাইরেও অন্যান্য বিষয়ে সঙ্গীর সঙ্গে সাদৃশ্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ। সকালে ঘুম থেকে ওঠা বা রাজনৈতিক আচরণের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সাদৃশ্য থাকার চেয়ে দুজনের মধ্যে ভাগাভাগির সত্তার একটি অনুভূতি তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।

৫. পরীক্ষাগারে মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ঘটানো সম্ভব

মস্তিষ্ক নিয়ে দুনিয়াজোড়া গবেষণা চলছে। তারই ধারাবাহিকতায় এবার যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক একটা যুগান্তকারী সাফল্য পেয়েছেন। তারা পরীক্ষাগারে মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ঘটাতে পেরেছেন। মগজের দুটি ভিন্ন অংশের মধ্যে নিউরনের যে স্থানান্তর (মাইগ্রেশন) হয়, সেটাও তারা পর্যবেক্ষণ করেছেন। যে প্রক্রিয়াটা আমাদের শরীরের ভেতরে সম্পন্ন হয়, সেটা তারা পরীক্ষাগারে নিজেদের বৃদ্ধি করা মগজে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হন। ব্যাপারটা অভাবনীয় ছিল, অভূতপূর্বও।

এই সাফল্যের অংশীদার বাংলাদেশের গবেষক সাইফুল ইসলাম। বিভিন্ন দেশের ১৬ জন গবেষকের সমন্বয়ে গঠিত এই দলে তাঁর অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাদের গবেষণার ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক এস পাসকা। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে সেই উদ্ভাবনের খবর অন্তত ৫০টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে।

৬. যৌন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয় সাইক্লিং

অতীতের কয়েকটি তত্ত্বে বর্ণনা করা হয়, সাইক্লিং পুরুষের যৌন স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। সেসব তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই এ গবেষণা। এতে উঠে এসেছে- সাইক্লিং পুরুষের তো কোনো ক্ষতি করেই না, বরং আরও উপকার করে। এটি স্থূলতার ঝুঁকি কমায়। পাশাপাশি শরীরে রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখে।

গবেষণা প্রবন্ধটি ইউরোলজি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। অ্যাথলেটদের তিন ভাগ করে (২ হাজার ৭৭৪ সাইক্লিস্ট, ৫৩৯ সাঁতারু ও ৭৮৯ দৌড়বিদ) গবেষণাটি চালানো হয়। তাদের নানা ধরনের যৌনসংক্রান্ত প্রশ্ন করা হয়। এতে দেখা যায়, সাইকেল চালালে চালকদের যৌন স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হয় না। উল্টো শারীরিকভাবে আরও ফিট থাকা যায়।

৭. কিশোর কিশোরীরা বেশি আত্মহত্যা প্রবণ

কিশোর কিশোরীদের যারা অবহেলা, কটূক্তি, অপরাধ প্রবণতা, পারিবারিক সহিংসতা এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হয়- তারা আত্মঘাতী এবং আত্মহত্যা প্রবণ বেশি হয়ে থাকে। লন্ডনের কিংস কলেজের একটি গবেষণায় এমন ফলাফলই দেখা গেছে। পৃথিবী জুড়েই কিশোরদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ আত্মহত্যা এবং আত্ম-পীড়ন।

এ বিষয়টিকে ঘিরে একটি দীর্ঘ মেয়াদী গবেষণা চালানো হয়। ১৯৯৪-৯৫ সালে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে জন্ম নেয়া দুই হাজার ২৩২ জন যমজদের দীর্ঘমেয়াদে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। গবেষণা থেকে উঠে আসা চিত্রে দেখা গেল যে, এক তৃতীয়াংশ কিশোর-কিশোরী তাদের ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সের মধ্যে অন্তত একবার গুরুতর নির্যাতন বা নিপীড়নের শিকার হয়ে থাকে। আর অন্তত ৭% দুই থেকে তিন ধরনের গুরুতর নিপীড়নের শিকার হয়। প্রায় এক পঞ্চমাংশের (১৮.৯%) ক্ষেত্রে ছিল কিছু স্ব-ক্ষতিকারক চিন্তা ও আচরণ।

৮. মেধাবীরা অলস হয়

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, যে সমস্ত মানুষের আইকিউ বেশি তারা সহজে একঘেয়েমিতে আক্রান্ত না হয়ে বেশি সময় ব্যয় করে চিন্তার পেছনে। বেশি কর্মঠ মানুষ কাজে মনোনিবেশ করে হয়তো চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে কাজ করে নয়তো তারা খুব দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

চিন্তাশীল মানুষগুলো চিন্তাহীনদের চেয়ে কম কর্মক্ষম। গবেষণার ফলাফল হেলথ সাইকোলজি জার্নালে Iপ্রকাশিত হয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে, ৭ দিনের এই পরীক্ষার শেষদিনে অর্থাৎ ছুটির দিনে এই দুই দলের কর্মক্ষমতায় কোন পার্থক্য পাওয়া যায়নি। এই একটা ব্যাপার গবেষণায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি। গবেষণার উপসংহার থেকে দেখা যায়, যে সমস্ত মানুষ চিন্তা কম করে তারা খুব সহজেই একঘেয়েমিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে বলে শারীরিক কর্ম দিয়ে সেই জায়গা পূরণ করে। অন্যদিকে মেধাবী মানুষগুলো অলস সময় কাটায় বেশি।

৯. শিশুর দেরিতে কথা বলার বড় কারণ হচ্ছে ‘স্ক্রিন’ ব্যবহার

বিষয়টি নিয়ে গত দুই বছর ধরে কানাডায় একটি গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, শিশুদের খাওয়ানোর কাজটা সহজ করতে অনেক পিতা-মাতা এসব স্ক্রিনের সাহায্য নিয়ে থাকেন। বাচ্চাদের হাতে তুলে দেন মোবাইল, ট্যাব বা স্ক্রিনযুক্ত ডিভাইস। এতে শিশুরা ওই ডিভাইসের স্কিনে বুধ হয়ে থাকে। কিন্তু এর পরিণতি যে মারাত্মক ক্ষতিকর তা হয়তো তারা জানেনই না। ফলে শিশুদের দক্ষতার বিকাশে বিলম্ব ঘটে। এর মধ্যে কথা বলতে এবং অন্যান্যদের সাথে মেলামেশা শিখতে দেরি হয়।

গবেষকরা বলছেন, বাচ্চারা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে যে সময়টা পার করছে, এই সময়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ আরো অনেক কিছু শিখতে পারতো। এই সময়ে আরেকজনের সাথে কথা বলা ও শোনার দক্ষতা তৈরি হতে পারে। দৌড়ানো, কোন কিছু বেয়ে উপরে ওঠার মতো শারীরিক দক্ষতাও সে অর্জন করতে পারতো।

১০. ঘুম কেড়ে নেয় সায়ান রং

গবেষণায় দেখা গেছে, চোখের ঘুম-ঘুম ভাব কেড়ে নিয়ে মস্তিষ্ক সজাগ করে তুলতে পারে একটি বিশেষ রং। রং-টির নাম সায়ান। সহজ করে বলতে গেলে, সবুজ আর নীল মেশালে যে রং হয় সে রকম। বিজ্ঞানীদের মতে, এই রং-এর মধ্যে এমন একটি গোপন উপাদান আছে, যেটা এক ঝটকায় মানুষের ঘুম তাড়িয়ে মস্তিষ্ককে সজাগ করে তুলতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক জানিয়েছেন যে, চোখের সামনে এই সায়ান রং বেশি মাত্রায় থাকলে মানুষের ঘুম কমে যায়। অন্যদিকে এই রং সরিয়ে রাখলে ঘুমিয়ে পড়া সহজ হয়।

১১. অম্ল ক্ষারের সমতা রক্ষা করে পানি

আমাদের দেহ নিরপেক্ষ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এটির মান ৭ দশমিক ৪। এর মানে হলো দেহে অম্ল ও ক্ষার সবর্দা সমপরিমাণে থাকে। কোনো কারণে অম্ল-ক্ষার সাম্যাবস্থা একটু এদিক-ওদিক হলে জীবন ধারণ হয়ে যায় কষ্টকর। অনেক সময় মৃত্যুও ঘটতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে দেহে অম্ল বা অ্যাসিড সামান্য পরিমাণে বেড়ে গেলে হৃদরোগ, অতিরিক্ত মুটিয়ে যাওয়া, ডায়াবেটিস, কিডনিতে পাথর, রোগ-প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া, অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ক্ষয়, অস্থিসন্ধি ও মাংসপেশিতে ব্যথা, দ্রুত ক্লান্তিবোধ করা ইত্যাদি সমস্যা হয়।

এর কারণ হিসেবে গবেষকরা বলেছেন, দেহে অম্লীয় বা অ্যাসিডিটি হলে দেহের ক্ষতিকর পদার্থগুলোকে কিডনি শরীর থেকে বের করে দিতে পারে না। এতে এগুলো শরীরে জমে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করে। এ থেকে মুক্তির পথও বলে দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। পানি শরীরের বিষাক্ত ও ক্ষতিকর পদার্থগুলো মূত্র, শ্বাস-প্রশ্বাস, পায়খানা ও ঘামের আকারে ত্বকের মাধ্যমে দেহ থেকে বের করে দেয়। এ জন্য প্রতিদিন দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করুন। বয়স বেড়ে গেলে শরীরে পানির পরিমাণ কমে যায়। এতে দেহ এসব ক্ষতিকর পদার্থগুলো বের করে দিতে পারে না। এ জন্য শরীরের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। তাই প্রচুর পানি পান করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *