রায় দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন বিচারপতি

২৬ মার্চে ভোরবেলায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা যা এখনো বাঙালি জাতিকে শিহরিত করে, অনুপ্রেরণা জোগায়। এটি বলে আবেগপ্রবণ হয়ে এজলাসে কেঁদে ফেলেন রায় প্রদানকারী বিচারপতি। এ সময় হাইকোর্টের এজলাস কক্ষে আবেগঘন দৃশ্যে তৈরি হয়।আজ রোববার দুপুরে ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স ন্যূনতম ১২ বছর ছয় মাস নির্ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে রায় প্রদানকালে এ দৃশ্যের অবতারণা হয়।  

বেলা সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হয়ে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা ধরে চলা রায় ঘোষণার শেষ পর্যায়ে এসে রায় প্রদানকারী হাইকোর্ট বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাটি পড়ছিলেন। এরপর হঠাৎ একটু থেমে যান। তারপর তিনি বলে উঠেন, ‘আমি একটু ইমোশনাল হয়ে গেছি। আমার মনে হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৬ মার্চ ভোরবেলার দেওয়া স্বাধীনতার এ ঘোষণাটি পড়লে যে কেউই আবেগপ্রবণ হয়ে যাবে।’ এ সময় তিনি বারবার চোখ মুছেন। এ দৃশ্যপটের অবতারণা হলে রিটের পক্ষের আইনজীবীরা দাঁড়িয়ে যান।

এক কঠিন সংকটময় পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত হওয়া বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ একাত্তরের রণাঙ্গনে অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। আর একাত্তর পরবর্তী সময়ে সেই ভাষণের মধ্যেই সমাজের অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষ খুঁজে নিয়েছে তাদের মুক্তির পথ। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণকে ঘিরে হাইকোর্টে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হলো।

রায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করে জারি করা সরকারের গেজেট ও এ সংক্রান্ত আইনের ধারা অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। সেই সঙ্গে আবেদনকারী মুক্তিযোদ্ধাদের বকেয়াসহ বন্ধ থাকা সম্মানী ভাতা পরিশোধ বা চালু করতে বলেছেন আদালত। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে এটি কার্যকর করতে বলা হয়েছে।

রিটের পক্ষের আইনজীবী পরে বলেন, এ রায়ের ফলে বয়সের ফ্রেম দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাকে নিরুপণ করা যাবে না।এর আগে মুক্তিযোদ্ধার ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে তিনটি গেজেট প্রকাশ করে সরকার। সর্বশেষ গেজেটে মুক্তিযোদ্ধার ন্যূনতম বয়স ১২ বছর ৬ মাস নির্ধারণ করা হয়। পরে এসব গেজেটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধা রিট করেন।আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন ব্যারিস্টার ওমর সাদাত ও এ বি এম আলতাফ হোসেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী এ আর এম কামরুজ্জামান কাকন ও শুভ্রজিৎ ব্যানার্জি। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেছুর রহমান।

পরে রিটকারীদের অন্যতম আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর সাদাত বলেন, রায় ঘোষণাকালে আদালত যখন ৭ মার্চের বক্তব্য পড়ছিলেন তখন তিনি (বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ) অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে যান। এ সময় তিনি (বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ) বলেন, যে আবেগের ভিত্তিতে এই দেশ সৃষ্টি হয়েছিল, কিন্তু সরকার যে আইন করেছিল সে আইনের কারণে আবেগটি ভূলুণ্ঠিত হয়ে গেছে।

এরপর রায় প্রদান করেন বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ। রায়ে তিনি ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স ন্যূনতম ১২ বছর ছয় মাস নির্ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করেন।

এর আগে ২০১৮ সালে বিভিন্ন সময় একাধিক রিটের শুনানি নিয়ে আদালত ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স ন্যূনতম ১২ বছর ছয় মাস নির্ধারণ করে সংশোধিত পরিপত্র কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, এই মর্মে রুল জারি করা হয়।মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, মুক্তিযোদ্ধা সচিব, যুগ্ম সচিব, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থ সচিব, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের (জামুকা) মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*